বিশ্বের ১০ বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনা

প্রকৃতি চলে তার আজব খেয়ালে। তাই প্রাকৃতিক অনেক ঘটনার কোন ব্যাখা নেই আমাদের কাছে। আমাদের দৌড় শুধু তা উপভোগ করায়। আজ আমি আপনাদেরকে জানাব বিশ্বের এমনই ১০টি আজব ও বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনা সম্পর্কে।

গ্লাস বিচ বা কাঁচের সৈকত

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ফোর্ট ব্র্যাগের কাছে ম্যাক্যারিচার স্টেট পার্কে অবস্থান এই গ্লাস বিচের। দিনের শুরুতে যখন সাগর পাড়ের রঙিন কাঁচ আর পাথরের ওপর সূর্যের আলো পড়ে, তখন তা দেখার মতো এক অভাবনীয় দৃশ্য হয়। এই কাঁচের টুকরোর সমুদ্র সৈকত অবশ্য প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়নি। ১৯০৬ সাল থেকে ফোর্ট ব্রাগের বাসিন্দারা তাদের নিত্য ব্যবহার্য বাতিল জিনিস এই সৈকতে ফেলা শুরু করে। ১৯৪৩ সালের দিকে এসে সৈকতের একটি অংশ কাঁচের ভাঙ্গা টুকরো ও বর্জ্যে একেবারে ভরে ওঠে।

তবুও ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত সৈকতের অন্যান্য অংশে ময়লা ফেলা চলতেই থাকে। তাই সমুদ্র রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন একটা সময় এখানে ময়লা ফেলা নিষিদ্ধ করে এবং সব আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে। কিন্তু থেকে যায় নানা রংয়ের কাঁচ। সেই কাঁচ বছরের পর বছর সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের সঙ্গে ঘষা লেগে মসৃণ থেকে মসৃণতর এবং আরো বেশি দ্যুতিময় হয়। যেনো এক একটি মহামূল্যবান পাথর আগ্নেয়গিরির আলো। এই ধরনের আলো দেখা যায় যখন কোন পর্বত থেকে অগ্ন্যুতপাত ঘটে।

পৃথিবীতে আইনের জন্মদাতা সম্রাট হাম্বুরাবির ১২ আইন

পর্বত থেকে অগ্ন্যুত্পাতের ঠিক আগ মুহুর্তে মারাত্মক ধরনের কিছু আলোর ঝলক ছিটকে আকাশে দিকে উঠে আসে এবং নিমিষে হারিয়ে যায়। বিষয়টা এতটা রহস্যময় যে অনেক বিজ্ঞানি নিজের ক্যামেরায় সেটাকে ধারন করার পরেও বিষয়টা সম্পর্কে পুরোপুরি ধারনা দিতে পারেননি। অনেকেই বলেছেন অগ্ন্যুতপাত এর ঠিক আগ মুহুর্তে কোন একটা উপাদান পাথরের ইলেক্ট্রিক চার্জকে ইলেক্ট্রিফাই করে ফেলে। ফলে এই ধরনরে আলোর বল এর সৃস্টি হয়।

ক্যানো ক্রিস্টাল রিভার

কলম্বিয়ায় অবস্থিত এই ক্যানো ক্রিস্টাল রিভার (cano cristales river) এখানে অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাস হওয়ায় এই নদীটির জলে বিভিন্ন ধরনের রঙের দেখা মেলে। নদী ধরে এগোতে থাকলে দেখা মেলে অপূর্ব সব রঙের। যে রঙের কারনে অদ্ভুত সৌন্দর্য পেয়েছে এই নদী। এখানের পাথরগুলি ১.২ বিলিয়ন বছরের পুরানো। যারা এই নদী সামনাসামনি দেখেছেন তারা এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নদী বলে থাকেন।

স্পাইডার ওয়েব

পাকিস্তান বা আজব মাকড়শা জাল ২০১০ এর জুলাইয়ের দিকে পাকিস্তানের সিন্ধু এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী ও প্রবল বন্যা হয়েছিল। সেই সময় ওই এলাকার মাকড়শা জাতীয় প্রাণীগুলো বিভিন্ন গাছে আশ্রয় নিয়েছিল। এবং সমগ্র এলাকার গাছগুলোকে জাল বুনে ছেয়ে ফেলেছিল। নজিরবিহীন এই ঘটনা বন্যা পিড়িত এলাকার লোকজনের জন্য বাড়তি উত্পাত হিসেবে দেখা দিয়েছিল।

পিংক লেক হিলিয়ার, অস্ট্রেলিয়া

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার ঠিক মধ্যখানের একটি দ্বীপে গোলাপী রঙ্গের একটি লেক রয়েছে, যার নাম লেক হিলিয়ার। এ লেকটি ৬০০ মিটার চওড়া কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে পুরো লেকটি গোলাপি রঙে বেষ্টিত। এর গোলাপি রঙের রহস্য এখনো পর্যন্ত রহস্যই হয়ে আছে। এর কারন অনুসন্ধানের কাজ এখনো অব্যাহত রয়েছে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী বলা হয়েছে যে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, সোডিয়াম লবণের উপস্থিতি নিজেদের মাঝে এক জটিল বিক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। যার ফলে এই গোলাপী রঙের আবির্ভাব। তবে এর সৌন্দর্য সত্যিই পাগল করবে আপনাকে।

ক্রিসমাস আইল্যান্ড

লাল কাঁকড়া ভারত মহাসাগরের ছোট্ট একটি দ্বীপ যার নাম ক্রিসমাস আইল্যান্ড। এটি অষ্ট্রেলিয়ার পার্থ শহর থেকে ২৬০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এই দ্বীপটি বিখ্যাত লাল কাঁকড়াদের জন্য এদের নামও তাই দেওয়া হয়েছে ক্রিসমাস আইল্যান্ডের। লাল কাঁকড়া দ্বীপটিতে এরা আছে প্রচুর পরিমাণে, তবে তাদের খ্যাতি কেবলই ভ্রমণের জন্য। কাঁকড়াগুলো প্রতিবছর একবার করে আশ্চর্য এক ভ্রমণে বের হয়। এই কাঁকড়াগুলো মূলত বাস করে ভূমিতে, কিন্তু বছরে একবার তারা পিকনিকের মত করে দলবেঁধে চলে আসে সাগরতীরে। মাসখানেকের ভ্রমণ শেষে, তারপর আবার জঙ্গলে ফিরে যায়। ক্রিসমাস আইল্যান্ডের লাল কাঁকড়ারা এই সাগর ভ্রমণ করে বর্ষাকালে, অক্টোবর-নভেম্বরে সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি কাঁকড়া ওই সময় একসঙ্গে সাগরের পথে পাড়ি জমায়। এমনকি তখন আকাশ থেকেও নাকি দেখা যায় কাঁকড়াদের ওই লাল লাল সারিগুলো।

প্রস্তরীভূত করা কুয়া

ইংল্যান্ডের উত্তর ইয়র্কশায়ের অবস্থিত প্রস্তরীভূত করা এই কুয়া এটি রহস্যময় এমন এক কুয়া যার পানি সব কিছুকে পাথর করে দেয়। কৌতূহলী অনেকেই সাহস করে ভয়ঙ্কর এই কুয়োর ধারে যান কোনোরকমে কুয়োর গা বেয়ে কিছু একটা ঝুলিয়ে দেন।পানির স্পর্শ লাগার সঙ্গে সঙ্গে ওইসব বস্তু পাথর হতে থাকে। ধারণা করা হয়ে থাকে, ওই কুয়ার পানিতে এমন কিছু আছে যার রাসায়নিক মাত্রা সবকিছুকে পাথরে পরিণত করে দেয়। এমন রহস্যময়তার কারণে ভয়ে অনেকেই কুয়ার ধারে কাছে যেতে চান না। কৌতূহলী অনেকেই দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন টেডি বিয়ার, সাইকেল, এমন কি কেটলি কেটলি। কুয়ার ধারে এখনও ঝুলছে অষ্টাদশ শতকের টুপি, চেইন।

মাছ বৃষ্টি, হন্ডুরাস

গেল ১শ’ বছর ধরে অদ্ভুত রকমের এক পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা অর্জন করে আসছে হন্ডুরাসের ইউরো শহরের বাসিন্দারা। প্রতি বছর মে কিংবা জুন মাসে মাছ বৃষ্টি হয় দেশটিতে। প্রচণ্ড বজ্রপাতের গর্জন আর বৃষ্টির পাশাপাশি ঝরতে থাকে শত শত মাছ। ওখানকার মানুষ খুব খুশি মনেই খাওয়ার জন্য সংগ্রহ করে সেই মাছ। তবে মাঝে মাঝে অনেকেই আহত হন মাথায় মাছ পড়ে।

মেরুপ্রভা বা নর্দান লাইট

ইংরেজিতে এটাকে বলা হয় ‘অরোরা’ বা ‘নর্দান লাইট’ আর বাংলায় ‘মেরুপ্রভা’। অরোরা হলো মেরু অঞ্চলের আকাশে দেখতে পাওয়া অত্যন্ত মনোরম ও বাহারি আলোকচ্ছটা। যাকে একসময় অতিপ্রাকৃতিক বলে বিবেচনা করা হতো। বর্তমানে তা নিতান্তই প্রাকৃতিক ঘটনা বলে প্রমাণিত। বায়ুমন্ডলের থার্মোস্ফিয়ারে থাকা অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন পরমাণুর সাথে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার থেকে আসা চার্জিত ইলেক্ট্রন, কিছু ক্ষেত্রে প্রোটনের সংঘর্ষের ফলেই অরোরা তৈরী হয়। তবে ইলেকট্রন সাধারণত পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র বরাবর পরিভ্রমণ করায় শুধু মেরু অঞ্চলেই অরোরা দৃশ্যমান হয়। অরোরা দর্শনের সবচেয়ে ভালো স্থান হলো আলাস্কা, কানাডা, এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ারের কিছু অঞ্চল। এসব স্থানে প্রায় নিয়মিতই মেরুজ্যোতি চোখে পড়ে। তবে মেরূপ্রভা সূর্যালোক থেকে অনেক ম্লান হওয়ায়, তা পৃথিবী থেকে দিনের বেলায় দেখা যায় না।

Leave a Comment