প্রাচনী যুগের পৃথিবী বিখ্যাত ৫ নারী শাসক

বর্তমানে নারীরা পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমান তালেও চললেও, প্রাচীন কালে সে পথ চলা এতটা স্বাভাবিক ছিলনা। সেই সময় নারীদেরকে অনেক বৈরি পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। কিন্তু তথাপিও সেই সময় কিছু নারী বসেছিলেন শাসন কার্যের একদম শীর্ষস্থানে। পুরুষদের মত তারা দেশ ও রাজ্য শাসন করেছিলেন সমান ক্ষমতায়। এখন আমি আপনাদেরকে জানাব প্রাচীন আমলের এমনই ৫জন নারী শাসক সম্পর্কে।

ক্লিওপেট্রা (Cleopatra)

ক্লিওপেট্রার পুরো নাম ক্লিওপেট্রা ফিলোপেটর। তার জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৬৯ সালে প্রাচীন মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায়। সাধারণভাবে তিনি ক্লিওপেট্রা সপ্তম হিসেবে পরিচিত। ক্লিওপেট্রা ছিলেন প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে প্রভাবশালী একমাত্র নারী শাসক। তিনি নিজেকে ইশ্বরের অবতার বলে দাবি করতেন। নিজ বংশের রক্তের পবিত্রতা রক্ষার জন্য তিনি তাঁর ভাতৃদ্বয় ত্রয়োদশ টলেমি ও চতুর্দশ টলেমির সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। রোমের রাজা জুলিয়াস সিজারের সাথে খুব গভীর রাজনৈতিক বন্ধুত্ব ছিল। ক্লিওপেট্রার জুলিয়াস সিজার রোমের মন্দিরে দেবী ভেনিস জেনেটিক্সের আদলে ক্লিওপেট্রার একটি সোনার মূর্তি পর্যন্ত বানিয়েছিলেন। যার কারনে ওই সময় রোমের জনগন সিজারের উপর বেশ নাখোশ হয়েছিলেন। এদিকে রোমের আরেক শাসক মার্ক অ্যান্টনি’র সাথেও ক্লিওপেট্রার গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ক্লিওপেট্রা মাত্র ৩৯ বছর বয়সে মারা যান, তার মৃত্যু নিয়েও বেশ বিতর্ক রয়েছে। তবে বেশীর ভাগ ইতিহাসবিদের ধারনা, বিষাক্ত সাপের ছোবলে আত্নহত্যা করেছিলেন তিনি।

উ জেটান (Wu Zetian)

চীনের ট্যাং সময়ের মহিলা শাসক ছিলেন উ জেটান। চীনের এই রানীকে দুর্ধষ আর ক্ষমতা লোভী নারী হিসেবেও ইতিহাসে আখ্যায়িত করা হয়েছে। কারন তিনি শুধুমাত্র ক্ষমতার লোভে নিজের মেয়েকে গলা টিপে হত্যা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই হত্যার দায় আবার তিনি তার সতীনের উপর বর্তিয়েছিলেন। খুনের দায়ে অভিযুক্ত সতীনকে রানীর পদ থেকে হঁটিয়ে নিক্ষেপ করা হয়েছিল কারা প্রকোষ্ঠে। এদিকে রাজা টাইজংয়ের মৃত্যুর পর তিনি বিয়ে করেন সিংহাসনের উত্তরাধিকারী রাজার ৯ম পুত্র গেয়াজং কে। মুলত গেয়াজং এর মৃত্যুর পর উ জেটান সিংহাসন সামলানোর সুযোগ পান। চীনের ইতিহাসে দুই ভাবে চিত্রিত করা হয়েছে উ জেটানের শাসনামলকে কেউ বলেছেন, উ জেটান ছিলেন খুবই নিষ্ঠুর আর ক্ষমতালোভী একজন শাসক আবার কেউ বলেছেন তার শাসনামলে চীনের কৃষি আর কর ব্যবস্থায় দারুন উন্নতি সাধন হয়েছিল। তিনি ছিলেন চীনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী সময় শাসন করা একমাত্র নারী। শাসক আর তার সময়ে চীনে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার হয়েছিল সবচেয়ে দ্রুত গতিতে।

ক্যাথেরিন দ্য গ্রেট (Catherine the Great)

রাশিয়ার ক্যাথেরিন টু কে ক্যাথেরিন দ্য গ্রেট নামেও ডাকা হয়। তার শাসনকাল ছিল ১৭৬২ থেকে ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দ। যৌন জীবন এবং রাজনৈতিক জীবনের জন্য ক্যাথেরিন সমধিক পরিচিত ছিলেন। ক্যাথেরিন রাশিয়ার মহান শাসক পিটার দ্য গ্রেটকে নিজের আদর্শ মনে করতেন। নিজের স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি রুশ সাম্রাজ্যের রানী বনে যান যদিও তার স্বামী পিটার তিনের মৃত্যুর জন্য অনেকে তাকেই দায়ী করেন। রানী ক্যাথেরিন তার সময়ে রাশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থায় আমুল পরিবর্তন আনেন। তিনি নিজেও অনেক বই লিখেছিলেন, তিনি ছিলেন শিল্প কলা অনুরাগী। তাই তো তৎকালীন সময়ে লেখক আর দার্শনিকদের সাথে নিয়ে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ উইন্টার প্যালেস নির্মাণ করেন যা পূর্বে রুশ শাসকদের বাসভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে তা হেরিটেজ জাদুঘর হিসেবে সারাবিশ্বে প্রসিদ্ধ। জীবদ্দশায় ক্যাথেরিনের তার বড় ছেলে পলের সাথে সম্পর্ক ভাল ছিলনা। পলের ধারনা ছিল তার মা তাকে মেরে ফেলতে চায় কিন্তু বাস্তবতা ছিল ক্যাথেরিন পলকে সুশিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন এবং তার সুরক্ষা করতে চেয়েছিলেন। ক্যাথেরিন খুবই চতুর কুটনৈতিক জ্ঞান সম্পন্ন নারী ছিলেন তার মৃত্যু নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও বেশীরভাগ ইতিহাসবিদের ধারনা, তার মৃত্যু হয়েছিল স্ট্রোকের কারনে।

রানী রুদ্রমা দেবী (Rani Rudrama Devi)

ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের এই রানী ভারতীয় ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা দখল করে আছেন। রানী রুদ্রমা দেবী ছিলেন ওয়ারাঙ্গাল এর রানী। ওয়ারাঙ্গাল ছিল দক্ষিণ ভারতের কাকাতিয়া রাজ্যের রাজধানী। রুদ্রমা দেবী তার সময়ে পুরো অন্ধ্র প্রদেশ জুড়ে তার শাসন সীমানা বিস্তার করেছিলেন। রুদ্রমা দেবীর পিতা রাজা গানপতি দেবার। কোন পুত্র সন্তান ছিলনা তাই তিনি তার মেয়ে রুদ্রমা দেবীকে একজন ছেলের মতই মানুষ করেছিলেন। পারদর্শী করেছিলেন যুদ্ধ বিদ্যায় আর তার নাম দিয়েছিলেন রুদ্র দেব। রুদ্রমা দেবী সব সময় একজন পুরুষের মতই বেশভূষায় থাকতেন এবং রাজ্য শাসন করতেন।

জীবনাচারের ১০টি ভুল জানি না বলেই শুদ্ধ হয় না

রাজা গানপতি দেবার মৃত্যুর পর মাত্র ১৪ বছর বয়সে রুদ্রমা দেবী রানী হিসেবে সিংহাসনে বসেন। তৎকালীন সময়ে ভারতের মত জায়গায় একজন নারী শাসককে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না ওই সময়ের জনগন। কিন্তু রুদ্রমা দেবী খুবই কুশলতার সাথে সব বিদ্রোহ দমন করতে সমর্থ হন। রুদ্রমা দেবীর শাসন কালে তার মন্ত্রী গুন্নাগান্নারেড্ডি তাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন। রুদ্রমা দেবীর বিয়ে হয়েছিল রাজা বীর বাহাদুরের সাথে কিন্তু বিয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই বারী বাহাদুর মারা যান। রুদ্রমা দেবী সম্মুখ যুদ্ধে খুবই পারদর্শী ছিলেন। তার সময়ে তিনি বহু যুদ্ধে নিজে অংশ গ্রহন করেছিলেন যতদুর জানা যায় আশি বছর বয়সে যুদ্ধরত অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছিলেন রুদ্রমাদেবী রানী।

প্রথম এলিজাবেথ (Elizabeth I of England)

ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেথ ছিলেন রাজা অষ্টম হেনরি এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যান বোলিনকের সন্তান। সৌভাগ্যক্রমে এলিজাবেথ ইংল্যান্ডের রানী হয়েছিলেন। এলিজাবেথের আড়াই বছর বয়সে তার বাবা তার মা এবং বোনের শিরচ্ছেদ করে হত্যা করেন। এলিজাবেথের পূর্বে ইংল্যান্ডের সিংহাসন সামলান তার সৎ ভাই ষষ্ঠ এডওয়ার্ড এবং বোন মেরি। কিন্তু তারা বেশী দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। এরপরই নানা ঘটনা চক্রে সিংহাসনে বসেন রানী প্রথম এলিজাবেথ। ওই সময় স্পেনের রাজা ফিলিপ টু এলিজাবেথকে বন্ধুত্বের পয়গাম পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এলিজাবেথ তা প্রত্যাখান করায় রাজা ফিলিপ ইংল্যান্ড আক্রমন করে বসেন কিন্তু তাতে তার শোচনীয় পরাজয় হলে ইংল্যান্ডে রানী এলিজাবেথের কদর বেড়ে যায়। এলিজাবেথ সব সময় ভারী মেকাপ আর জৌলুসপূর্ণ পোষাক পড়ে নিজেকে সুন্দর দেখাতে চাইতেন। কিন্তু ইতিহাসবিদদের মতে তিনি মোটেও সুন্দরী ছিলেন না। এলিজাবেথ ছিলেন চিরকুমারী তাই তার মৃত্যুর পর সিংহাসনের কোন উত্তরাধিকার ছিল না। তার মৃত্যুর পর স্কটল্যান্ডের রাজা জেমস সিক্স সিংহাসনের দায়িত্ব পান। তিনি একক ভাবে ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ড শাসন করেন, পরে দেশ দুটি মিলে তৈরি হয় ইউনাইটেড কিংডম বা যুক্তরাজ্য।

1 thought on “প্রাচনী যুগের পৃথিবী বিখ্যাত ৫ নারী শাসক”

  1. Pingback: উত্তর কোরিয়ার ভয়ংকর ১০ অস্ত্র – Yify Subtitles

Leave a Comment